Bangla sms

বেড়ানোর কথা ভাবছেন? ঘুরে আসুন একবার কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান থেকে

এবারের পর্যটন মাসে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবছেন? যদি দেশের বাইরে যেতে চান, তাহলে সেটা অন্য কথা। আর যদি দেশের মধ্যে কোথাও যেতে চান তাহলে বেচেনিন কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান কে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক মনোরম পরিবেশ তথা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গঠিত এ কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। এটি রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান এর আয়তন ৫ হাজার ৪৬৪ হেক্টর বা ১৩ হাজার ৫০০ একর প্রায়। হ্রদ, পাহাড়, নদী, খাল, ঝরনা ছাড়াও এ উদ্যানের মূল আকর্ষণ নানা রকম পাখি আর বন্যপ্রাণী।

উপমহাদেশের যে কটি প্রাচীন উদ্যান আছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কাপ্তাই উপজেলায় এটি গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৫৩ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এ প্রাকৃতিক উদ্যানের অবস্থান। আর রাঙ্গামাটি শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। ১৮৭৩, ১৮৭৮ এবং ১৮৭৯ সালে এখানে বনায়নের ফলেই গড়ে উঠেছিল একটি ক্রান্তীয় বনাঞ্চল। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনের আওতায় ১৯৯৯ সালে এটি জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পায়। এর আগে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান সীতাপাহাড় সংরক্ষিত বনের অংশ ছিল।

পাহাড়ের ঢালে ঢালে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। নানা রকম গাছপালা সমৃদ্ধ এ উদ্যানে আছে– সেগুন, চাপালিশ, জারুল, চম্পা, সোনালু, চালতা, চিকরাশি, শাল, শিলকড়ই, ধারমারা, গামারি, অর্জুন, আমলকি, আমড়া, বহেরা, বাজনা, বড়ই, পিটরাজ, পিটাল, বাঁশপাতা, বৈলাম, নাগেশ্বর, হিজল, উদল, উরিয়া, লোহাকাঠ ইত্যাদি। এসব গাছপালার ছায়ার নিচ দিয়ে আঁকাবাঁকা পায়েচলা পথে হাঁটলে মন হারিয়ে যাবে অজানায়।

নানান জীববৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এ বনাঞ্চল। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের বাসিন্দাদের মধ্যে আছে বন্যহাতি, হরিণ, হনুমান, উল্লুক, শুকর, বনবিড়াল, গুইশাপ, অজগর ইত্যাদি। ভাগ্য ভালো থাকলে বিশ্বের অন্যতম বড় বিষধর সাপ শঙ্খচুরের দেখা পেয়ে যেতে পারেন। বর্তমানে প্রায়ই এ বনে বন্যহাতির দেখা মিলছে। দলবেঁধে হাতিরা বনের ভেতরে ঘুরে বেড়ায় অবাধে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখপাখালির নিরাপদ বিচরণ ক্ষেত্র এই জঙ্গল। ধনেশ, ফিঙ্গে, বুলবুলি, কাঠময়ূর, বনমোরগ, ময়না, ঘুঘু, টিয়া, মাছারাঙ্গাসহ নানান ধরনের পাখির দেখা মিলবে গাছের ডালে, ঝোপের আড়ালে। তবে তাদের দেখতে চাইলে ঠোঁটে কুলুপ এঁটে চলতে হবে বনের পথে।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান

বন এলাকা ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির আওতায় বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণস্থান আর পায়েহাঁটা পথ তৈরি করা হয়েছে এ বনে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও উল্লেখযোগ্য পথটি হল ব্যাঙছড়ির মাঝারি বনপথ। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের ব্যাঙছড়ি মারমাপাড়া থেকে শুরু হওয়া বনের ভেতর পথটির দৈর্ঘ্য আড়াই কিলোমিটারের একটু কম। এ পথেই জীববৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি। রয়েছে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং টাওয়ার। উঁচুনিচু পাহাড়ি এ পথে আরও আছে ছোটবড় কয়েকটি ঝরনা।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান এলাকায় আছে মারমা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের দুটি গ্রাম। একটি ব্যাঙছড়ি মারমাপাড়া অন্যটি চিৎমরম (চিংম্রং) বড়পাড়া। এসব গ্রামে দেখতে পাবেন তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। তবে গ্রামে প্রবেশের আগে অবশ্যই কারবারি বা হেডম্যানের অনুমতি নিয়ে নিতে হয়।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা আকাশপথে চট্টগ্রাম আসতে হবে। এখানে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে পনের মিনিট পরপর বাস ছেড়ে যায় কাপ্তাই এর উদ্দেশ্যে। পৌঁছাতে সময় লাগে দেড়-দুই ঘন্টার মতো। ভাড়া ৬৫ থেকে ১০০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি কাপ্তাই যায় ডলফিন, সৌদিয়া, এস আলম, শ্যামলী পরিবহনের বাস। ঢাকার কলাবাগান, ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ থেকে এসব বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।

থাকবেন যেখানে

থাকার জন্য রয়েছে সাধারণমানের কিছু হোটেল। কাপ্তাই শহরের এসব হোটেলগুলো হল- হোটেল থ্রি স্টার, হোটেল নিরাপদ, বোয়ালখালি বোর্ডিং, কামাল বোর্ডিং ইত্যাদি। ২০০ থেকে ৬০০ টাকায় দুইজন থাকার কক্ষ আছে। এ ছাড়া বন বিভাগের রেস্ট হাউজ, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আবাসিক লজ (ছোট্ট বাড়ী) এবং বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফআইডিসি) রেস্ট হাউজ। অবশ্য এখানে রুম বুকিং পেতে হলে পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে। কাপ্তাই এলাকায় খাবার জন্য সাধারণ মানের বেশ কিছু রেঁস্তোরা আছে। সবচেয়ে ভালো খাবারের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এবং বিজিবি (সাবেক বিডিআর)এর নিয়ন্ত্রনাধীন ঝুম রেঁস্তোরা উৎকৃষ্ট। তাছাড়া স্থানীয় কাপ্তাই নতুন বাজারের খাবার হোটেলের বেশ কয়েকটি হোটেলের মধ্যে কাপ্তাই হোটেলের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের রেস্ট হাউজ

জঙ্গল ভ্রমণে করণীয়

সবসময় হালকা কাপড় পরবেন। পোশাকের রংও হবে হালকা। পায়ে পরবেন জুতা। রোদচশমা, রোদটুপি, ছাতা, পানির বোতল সঙ্গে নেবেন। বর্ষায় ভ্রমণে গেলে অবশ্যই ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে নিন। পোকামাকড় আর মশার হাত থেকে বাঁচতে পতঙ্গনাশক ক্রিম নিতে ভুলবেন না। জঙ্গলে বর্ষায় জোঁকের উপদ্রব বাড়ে। তাই জোঁক থেকে বাঁচতে মোজার মধ্যে প্যান্ট গুঁজে নিন। দূরের বন্যপ্রাণী আর পাখি দেখতে দুরবিন নিতে পারেন। জঙ্গলে ভ্রমণের সময় যথাসম্ভব চুপচাপ থাকার চেষ্টা করুন। বেশি আওয়াজে বন্যপ্রাণীরা বিরক্ত হয়। তখন তাদের দেখা পাওয়া কঠিন হবে। প্লাস্টিক জাতীয় প্যাকেট, বোতল, ক্যান সঙ্গে আনলে সেগুলো বনে ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না। সঙ্গে করে বাইরে এনে ময়লা ফেলার জায়গায় ফেলুন।

জঙ্গলে যা করবেন না

পিকনিক করতে জঙ্গলে যাবেন না। ভ্রমণে উচ্চশব্দে বা মাইকে গান কিংবা কোনোকিছু বাজাবেন না। বন্যপ্রাণীরা বিরক্ত হয় এমন কোনো শব্দ কিংবা আওয়াজ করবেন না। ময়লা, প্লাস্টিক জাতীয় কোন কিছু জঙ্গলে ফেলবেন না। বনে ধূমপান করবেন না।

প্রয়োজনীয় তথ্য

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে একাকী ভ্রমণ না করাই ভালো। দলবদ্ধভাবে ভ্রমণে গেলে অবশ্যই অভিজ্ঞ গাইড সঙ্গে নেওয়া উচিৎ। তাতে জঙ্গলে ভ্রমণ এবং বন্যপ্রাণী দেখা সহজ হবে। কাপ্তাই উদ্যানে প্রশিক্ষিত কয়েকজন গাইড আছেন। নির্ধারিত সম্মানির বিনিময়ে এসব গাইডের সেবা নেওয়া যাবে।

এছাড়া যে কোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারেন কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান কার্যালয়ের ফোন নাম্বারে: ০৩৫২৯-৫৬৩৫৭ (মোবাইল থেকেও এই নাম্বারে ফোন করা যাবে)।

তাহলে আর দেরি কেন? ঘুরে আসুন নিজ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান থেকে।

ধন্যবাদ ………… ভাললাগলে শেয়ার করুন।