Bangla sms

অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয় পবিত্র আশুরা

কারবালার ইতিহাস থেকে আমাদের অনেক শিক্ষা রয়েছে। এ ইতিহাস আমাদের দিগ্বিজয়ী হতে শিক্ষা দেয়। জাতি যখন ইয়াজিদি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছিল না, সত্য উপলব্ধি করার পরও যখন তারা অনিয়ম, নির্যাতন নীরবে হজম করে চলছিল, তখন ইমানের পাটাতনে দাঁড়িয়ে সাহসের বলিষ্ঠ উচ্চারণে ইমাম হোসাইন (রা.) ফোরাতের তীরে ছুটে আসেন। ইয়াজিদি স্বৈরশাসন মেনে নিলেই তাকে এমন নির্মম কারবালার মরুপ্রান্তরে প্রাণ দিতে হতো না। সামান্য আপসকামী হলেই শহীদি রক্তের ফোঁটায় ফোরাত নদীর পানি রক্তবর্ণ ধারণ করত না। কিন্তু ইমাম হোসাইন (রা.) জাহেলিয়ার কালো পর্দা উন্মোচন করে সত্যকে প্রোজ্জ্বল করেন।

হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এ মাসেই বহু নবী-রাসুল ইমানের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছিলেন। অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা এ মাসে সংঘটিত হয়েছিল। এই মাসেরই ১০ তারিখকে বলা হয় পবিত্র আশুরা । মূলত পুরো মহররম মাসের মধ্যে এই ১০ তারিখই সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

বহু আগে থেকেই আরব দেশে চারটি মাস পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হতো। এ মাসগুলোতে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ, মারামারি, লুটতরাজসহ সহিংস কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ছিল। এই চার মাসের একটি হচ্ছে মহররম। হাদিসে এসেছে মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন আল্লাহ তাআলা আসমান, জমিন, লওহ-কলম, সাগর, পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি করেছেন। এদিনই সংঘটিত হবে কেয়ামত।

মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.) আল্লাহর খলিফা হিসেবে দুনিয়াতে আসেন এদিনই এবং তার তওবা কবুলও হয় এই দিনে। ঝড়-তুফানের কবল থেকে হজরত নূহ (আ.) এর নৌকা পরিত্রাণ পাওয়া, নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে হজরত ইব্রাহিমের (আ.) উদ্ধার লাভ, হজরত আইয়ুবের (আ.) কঠিন রোগ থেকে মুক্তি, হজরত ইউনুসের (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন এদিন। আল্লাহ তাআলা হজরত ঈসাকে (আ.) জীবিতাবস্থায় ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন এই দিনেই। এ ছাড়া অত্যাচারী ফেরাউনের কবল থেকে মুসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে এদিনই উদ্ধার করেছিলেন আল্লাহ তাআলা। সেই সঙ্গে নদীতে ডুবে এই দিনই ফেরাউনের মৃত্যু হয়েছিল।

পবিত্র আশুরার তাৎপর্য পূর্ণ বিশেষ ঘটনা হচ্ছে কারবালায় তৎকালীন শাসক অত্যাচারী ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়েই শাসক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল হজরত ইমাম হোসাইনকে (রা.)। নিজের চোখের সামনে শিশুসন্তানকে শহীদ হতে দেখেছিলেন এই যোদ্ধা।

তারপরও অন্যায়কারীদের কাছে মাথা নত করেননি তিনি। সত্য, ন্যায় ও আদর্শের জন্য আত্মত্যাগের যে চরম দৃষ্টান্ত হোসাইন (রা.) মুসলমানদের সামনে রেখে গেছেন, তা চিরকালের জন্য অনুকরণীয়। এই দিনটিকে স্মরণ করেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন- ‘ফিরে এলো আজ সেই মোহররম মাহিনা /ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না !’

‘মাথা নোয়াবার নয়’- মহররমের এই চরম সত্যকে উপলব্ধি করে সমাজের সব ধরনের পঙ্কিলতা, অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। ন্যায়ের পতাকা সমুন্নত রাখতে প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করার মতো সাহস আমাদের ধারণ করতে হবে। মহররমের এই শিক্ষাকে যদি আমরা প্রত্যেকে অন্তরে ধারণ করি, কেবল তখনই আমরা সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধ একটি জাতি গঠন করতে পারব।

পবিত্র আশুরার তাৎপর্য

মাওলানা আনোয়ার-উল-করিম এর সম্পাদকীয় কলাম থেকে:

১০ মহররম তথা পবিত্র আশুরা মানব জীবনে এক তাৎপর্যময় দিবস। শুধু ইসলামের ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব সৃষ্টির ইতিহাসসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনার অবতারণাই ১০ মহররম তথা পবিত্র আশুরা দিবসে। সংগত কারণেই পবিত্র আশুরার তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। আশুরার গুরুত্ব সব নবীর যুগেই স্বীকৃত ছিল। আদি মানব হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, বেহেশত, দোজখ, আকাশ, পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য, বায়ু, আগুন, পানি ইত্যাদি সবই সৃষ্টি হয়েছে এ আশুরা দিবসে। নমরুদের অগ্নিকুন্ড- থেকে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মুক্তিলাভ, ফেরাউনের কবল থেকে হজরত মুসা (আ.)-এর নীল নদ পাড়ি দিয়ে মুক্তিলাভ, মাছের উদর থেকে হজরত ইউনুস (আ.)-এর মুক্তিলাভ, মহাপ্লাবন থেকে হজরত নুহ (আ.)সহ ইমানদার মুসলমানদের মুক্তিলাভসহ ইসলামের ঐতিহাসিক সবই ঘটেছে এ আশুরা দিবসে। সর্বশেষ কিয়ামতও এ দিবসেই সংঘটিত হবে। সে হিসেবে এ দিবসটি মুসলিম মিল্লাতের জন্য আনন্দের সুবাতাসবাহী। কিন্তু একই দিবসে কোনো ঘরে যদি কারো জন্মলাভ ঘটে বা বিয়ে হয় এবং সে দিনই যদি ওই ঘরের কোনো সদস্য পরলোকে গমন করে, তাহলে যেমন বিয়ে ও জন্মদিনের সব আনন্দে বিষাদের ছাই পড়ে, তেমনি আশুরা দিবসের সব সুখকর অনুভূতির সাগরে বেদনার নীল আবহ ছড়িয়ে দিয়েছে ইমাম হোসাইনের বিয়োগান্ত শাহাদাত। কারণ, এ দিবসেই ইসলামের সবচেয়ে রোমহর্ষক, নৃশংস ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে নবী-দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত বরণের মাধ্যমে।

বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদরের দুলাল এবং ইসলামের ইতিহাসের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) ও নবীদুলালী ফাতিমাতুজ্জাহরা (রা.)-এর পুত্র ইমাম হোসাইন (রা.)। তিনি চতুর্থ হিজরির ৩ শাবান, শনিবার মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অসত্যের বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সত্যপথযাত্রীদের প্রাণের সান্ত্বনা। স্বৈরশাসক ও জালিম শাহির পতন আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল আপসহীন। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, দুঃশাসনের জগদ্দল পাথর সরিয়ে জাতির কল্যাণে মানবতাবাদীদের সামনে এগিয়ে যেতে হয়। ৬১ হিজরির ১০ মহররম স্ব-পরিবারে তাকে নির্দয়ভাবে শহীদ করে দেয়া হয়। তার হত্যাকারী ছিলেন সিনান ইবনে আনাস মতান্তরে আমর ইবনে জিলসাওসান।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : ইমাম হোসাইনকে কেন শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করতে হয়, সে এক মর্মান্তিক কাহিনী। ইতিহাসসূত্রে জানা যায়, পিতা আলী (রা.)-এর শহীদ হওয়ার পর ইমাম হোসাইন (রা.) স্বীয় বড় ভাই হজরত হাসান (রা.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। ৬ মাস পর হজরত হাসান আমির মুয়াবিয়ার সঙ্গে পরিস্থিতির শিকার হয়ে তার হাতে খেলাফতের দায়িত্বভার তুলে দেন। এতে ইমাম হোসাইন (রা.) অসন্তুষ্ট হয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। কিন্তু পরে বড় ভাইয়ের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত সম্মতি প্রকাশ করেন। ৬০ হিজরিতে আমির মুয়াবিয়া ইন্তেকালের কিছু দিন আগে নিজ পুত্র ইয়াজিদকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন এবং তার হাতে সংঘবদ্ধভাবে উম্মতের বায়াত প্রদানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সে সময় যেহেতু ইয়াজিদের চেয়েও খেলাফতের উপযুক্ত সাহাবিরা জীবিত ছিলেন, তাই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা এ প্রস্তাবে আপত্তি তোলেন এবং অধিকাংশ সাহাবি তাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এদিকে ইয়াজিদ শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সর্বপ্রথম যারা তার বায়াত গ্রহণ করেননি, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। শুরু হয়ে যায় ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার সমর্থিত নেতাকর্মীদের ওপর ইয়াজিদি নির্যাতন। এতে সত্যের পতাকাবাহী আপসহীন সংগ্রামী ইমাম হোসাইন (রা.) মদিনা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ঠিক সেই সময় ইরাকের কুফাবাসী বিভিন্ন চিঠিপত্র এবং প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে ইমাম হোসাইনকে রাষ্ট্রাধিনায়ক মেনে নেয়ার এবং সার্বিক সহযোগিতার প্রস্তাব পাঠাল। তারা এই সঙ্গে ইয়াজিদি দুঃশাসনের জাঁতাকল থেকে জাতির মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার অঙ্গীকার জানাল। ইতোমধ্যে ১৮ হাজার কুফাবাসী ইমাম হোসাইন (রা.)-এর নামে বায়াত গ্রহণ করল। তাই ইমাম হোসাইন (রা.) নিশ্চিন্তে কুফায় আসতে চাইলেন।

এদিকে ইয়াজিদের কানে হাজার হাজার কুফাবাসীর ইমাম হোসাইনের নামে বায়াত গ্রহণের কথা পৌঁছাল। তিনি কালবিলম্ব না করে তৎকালীন গভর্নর নোমান বিন বশিরকে বরখাস্ত করে উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে তদস্থলে গভর্নর মনোনীত করেন। উবায়দুল্লাহ কুফায় এসেই কঠোর নীতি অবলম্বন করে ইমাম হোসাইনের বিশ্বস্ত সহচর মুসলিম বিন আকিলকে গ্রেফতার করে হত্যা করেন। এ খবর পথিমধ্যে ইমাম হোসাইন (রা.) শুনে পরিস্থিতি আঁচ করতে পারলেন। তারপরও দৃঢ়প্রত্যয়ী হোসাইন (রা.) রাস্তা থেকে ফিরে আসাকে সংগত মনে করলেন না। মাঝপথে কারবালা নামক স্থানে উবায়দুল্লাহর সৈন্যবাহিনী তাকে অবরোধ করে দাঁড়ায়।

ইমাম হোসাইন (রা.) নির্ভয়ে দীপ্তভাবে ইয়াজিদের সৈন্যদের উদ্দেশে আবেগ-বিহ্বল কণ্ঠে বললেন : তোমরা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি কর। অথচ আমার একটি মাত্র অপরাধ যে, আমি ইয়াজিদের মতো একজন পথভ্রষ্ট ও অধার্মিক ব্যক্তিকে মুসলমানদের আমির স্বীকার করতে পারিনি। আর সে অপরাধেই তোমরা আমার রক্ত প্রবাহিত করতে দাঁড়িয়েছ?

এ বক্তব্য শোনার পর ইয়াজিদের একমাত্র সেনাপতি ‘হোর’ ইয়াজিদি দল ত্যাগ করে হোসাইন (রা.)-এর দলে এসে যোগ দেয়। ফলে শুরু হয় যুদ্ধ। বীর বিক্রমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইমাম বাহিনীর সবাই। ইমানি বলে বলীয়ান নির্ভীক সৈনিকরা একে একে সবাই শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন। শহীদদের তাজা খুনে লাল হলো ফোরাতের তীর। এই হলো ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

মূলত ইমাম হোসাইন (রা.)-কে শহীদ হতে হয়েছিল জালিম শাসক ইয়াজিদ সরকারের বিচ্যুতির প্রতিকার চাইতে গিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন শাসন ব্যবস্থাকে তার সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসতে। তিনি চেয়েছিলেন মজলুম মানবতার মুক্তি। হোসাইন (রা.)-এর সংগ্রাম কোনো কাফির শাসকের বিরুদ্ধে ছিল না। তার সংগ্রাম ছিল নামধারী মুসলিম শাসক ইয়াজিদের বিরুদ্ধে। ইসলামের লেবেল গায়ে জড়িয়ে যারা অনৈসলামিক কর্মকা-কে জায়েজ বানাতে চায়, যারা নিরপরাধ মানুষ খুন করে, যারা রক্তের হোলিখেলার মধ্য দিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার অনৈসলামিক স্বপ্নে বিভোর তাদের বিরুদ্ধে। অন্যভাবে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সংগ্রাম ছিল একটি মুক্তিযুদ্ধ। সেটি ছিল মানবতার মুক্তি, দুঃশাসন থেকে মুক্তি। এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে যে কখনো আপস হতে পারে না, জোট হতে পারে না ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের স্মৃতিবিজড়িত আশুরা-মহররম তা-ই শিক্ষা দেয়। জাতির স্বাধীনতা হরণ করা হলে যে গর্জে উঠতে হয়, তা-ই শেখায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী নেটওয়ার্ক যে অত্যন্ত সুবিস্তৃত। এ জন্য সত্যপথযাত্রীদের টুঁটি চেপে হত্যার পরম্পরায়ই ইমাম হোসাইনকে শহীদ হতে হয়।

এ কথা দিবালোকের মতো সত্য যে, ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না। নিষ্ঠুর ইতিহাসের সংঘটক কেউই যে মহান আল্লাহর অলঙ্ঘনীয় বিধান থেকে রেহাই পায় না, কারবালায় ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের পর তা-ই প্রমাণিত হয়েছে। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর নির্মম মৃত্যুসংবাদ শুনে মক্কা, মদিনা ও কুফায় বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বিক্ষুব্ধ জনতা ক্ষোভে মুহ্যমান হয়ে দুরাত্মা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়। এ বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন বিপ্লবী নেতা মোক্তার। তিনি কুফার ঘরে ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ইমাম হোসাইনের হত্যাকারীর সাথে জড়িতদের তরবারির আঘাতে হত্যা করেন। এ সংঘর্ষে ইয়াজিদ সেনাপতি সিমারসহ ২৮৪ জন ঘাতক প্রাণ হারায়। এক পর্যায়ে মোক্তার সদলবলে কুফার গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের সম্মুখীন হন। টাইগ্রিস নদের শাখা জাবের তীরে উভয়ের যুদ্ধ চলাকালে কুখ্যাত জিয়াদ এক সাধারণ সৈনিকের বর্শাঘাতে বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

কারবালার ইতিহাস তথা পবিত্র আশুরার তাৎপর্য থেকে আমাদের অনেক শিক্ষা রয়েছে। এ ইতিহাস আমাদের দিগ্বিজয়ী হতে শিক্ষা দেয়। জাতি যখন ইয়াজিদি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছিল না, সত্য উপলব্ধি করার পরও যখন তারা অনিয়ম, নির্যাতন নীরবে হজম করে চলছিল, তখন ইমানের পাটাতনে দাঁড়িয়ে সাহসের বলিষ্ঠ উচ্চারণে ইমাম হোসাইন (রা.) ফোরাতের তীরে ছুটে আসেন। ইয়াজিদি স্বৈরশাসন মেনে নিলেই তাকে এমন নির্মম কারবালার মরুপ্রান্তরে প্রাণ দিতে হতো না। সামান্য আপসকামী হলেই শহীদি রক্তের ফোঁটায় ফোরাত নদীর পানি রক্তবর্ণ ধারণ করত না। কিন্তু ইমাম হোসাইন (রা.) জাহেলিয়ার কালো পর্দা উন্মোচন করে সত্যকে প্রোজ্জ্বল করেন।

তাই তো জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের ও জিল্লতের পরিবর্তে নাজাতের মহিমায় ভাস্বর ঐতিহাসিক দিবসের নাম আশুরা। পৃথিবীর ইতিহাসে সত্য প্রতিষ্ঠাকারীদের আদর্শে শানিত মানবতার মুক্তিদূত বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের স্মৃতিবিজড়িত কারবালার ঘটনা বাতিলের বিরুদ্ধে হকের চিরন্তন সংগ্রামের এক নবতর সংযোজন। কারবালার প্রান্তরে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ ও স্বার্থত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত মুসলিম ইতিহাসে নতুন প্রেরণায় উদ্দীপ্ত হয়ে রয়েছে। কারবালার আত্মত্যাগ কোনো মৃত ঘটনা নয়; বরং জীবন্ত একটি ঘটনার অগ্ন্যুদ্গিরণ। প্রতি বছর সেই কারবালা দিবস এসে আমাদের এ যুগের ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী মনোভাব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে শেখায়। প্রয়োজনে বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণের শিক্ষা দেয়।

মাওলানা আনোয়ার-উল-করিম: ইসলামী চিন্তাবিদ ও কলাম লেখক